একক সুমন – কিছু কথা, কিছু স্মৃতি...
এই লেখাটা কিছুদিন
আগে, ৫ই মার্চ, চন্দননগরে কবীর সুমনের অনুষ্ঠানের পরে লেখা।
“তোমার কথা শুনতে ভাল
লাগে বন্ধুরা বলে, শোনায় তোমার কথা আমায় প্রায়-ই/ তাই শুনলাম তোমার কথা গান শোনার
ছলে, শুনলাম- তোমাকে চাই...” – অঞ্জন দত্তের এই গান যে সুমনের জন্য লেখা তা প্রায়
সকলের জানা (যারা সুমনের গান শোনেন)। কথা- কথকতা – গান আর কথার মধ্যে মিশে থাকা
সময়ের কথা- আর এক মিশে থাকা প্রেম, ক্ষোভ, যন্ত্রণা , দুঃখ, আবেগ, লজ্জা আর
উল্টোদিকে একরাশ কালো কালো মাথা,ফেলে আসা
সময়ের হাতছানি, কিছু খণ্ড খণ্ড স্মৃতির ভেলায় ভেসে যাওয়া মন -এই সব নিয়েই তৈরি হয় – কবীর সুমন একাকী।
১৯৯২ থেকে ২০০৪ অবধি আমি কলামন্দির এ সুমনের প্রায় সব অনুষ্ঠান দেখেছি। কিন্তু
২০০৩ থেকে কলকাতার বাইরে থাকার ফলে “একক সুমন” এর কথকতা শোনার সুযোগ আর হয়নি। কিন্তু
২০০৪ এর পর আবার কাল শুনলাম- ১৩ বছর পরে – চন্দননগরে।
বছর তেরো – একটা যুগ –
সুমন আজ প্রায় ঊনসত্তর। বয়স বেড়েছে , সময়ের সাথে শরীরের জোর কমেছে। আজ সুমন বসে
অনুষ্ঠান করেন , হাতের স্নায়বিক অসুবিধার
জন্য গীটার বাজাতে পারেন না। কিন্তু যেটা আজও অম্লান – সে হল সেই গায়কি,মেজাজ – আর
সেই পরিবেশনা। মঞ্চের ওপর সেই একই আওয়াজ – “ হাল ছেড়োনা বন্ধু...” যা স্মৃতির
ভেলাকে নিয়ে চলে যায় কখনও ৯০ দশকের কোন সন্ধ্যেতে কলামন্দির-এ আবার কখনও চলে ছুঁয়ে
যায় রবীন্দ্র সদন বা উনিভারসিটি ইন্সিটিউট হলের কোন মুহূর্ত কে। এখনও সেই গায়কি –
সুরের সপ্তমে একই ভাবে বিচরণ করে – চেনা অচেনা সুরের জালে জালে। আর তার সাথে গল্প –
গল্পের সাথে গান। এই পরিবেশনা বাংলা গানে সুমন নিয়ে আসেন। আর আমরা তখন ভিড় জমাতাম
এই কথকতা টানে। একটা “একক সুমন” মানে অভিজ্ঞতার ঝুলিতে আসত একরাশ চিন্তার ফসল। আর
গানের নৌকো ভেসে চলেছে এ ঘাট থেকে ও ঘাটে। এ ঘাটে সলিল চৌধুরী তো ওই ঘাটে হিমাংশু দত্ত। তার সাথে মিশে যাচ্ছে পান্নালালের প্রানের আরাম। কিন্তু
“রাষ্ট্র” ছাড়া একক সুমন যেন সম্পূর্ণ হয়না – কারন তা শুধু সুমনের গান। তাই জোর
করেই বলে দিলাম সুমন দা – রাষ্ট্র – চার লাইন হলেও চলবে। সুমন গাইলেন – যা মিশে
গেল কথকতার মেজাজে।
আমার ছোটবেলাতে আমাদের
বাড়িতে একজন আসতেন, কোন গ্রাম থেকে কথকতা শোনাতেন – মনসামঙ্গল এর গল্প থেকে আবার
রামায়ন থেকে। একবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মিনিয়াপলিস শহরে , আমেরিকার স্বাধীনতা
দিবসের দিন একজন লোক দেখি গীটার নিয়ে আমেরিকার বীর-গাথা গাইছে। সেই কথকতা। রাস্তার ধারে ঠায়
দু ঘণ্টা দাঁড়িয়ে শুনেছিলাম। আর “একক- সুমন”
? সেটা আমার কাছে “মহালয়া” শোনার মত- চিরন্তন প্রবাহমান – “যতবার আসি ততবার বলি –
শুধু তোমাকেই চাই”।
সুমন কে আমি ব্যক্তিগত
ভাবে চিনিনা। কিন্তু আমি সুমনের প্রথম সারির শ্রোতাদের একজন। আমি শ্রোতার শ্রেনিতে
বিশ্বাস করি। আমার মত আরও অনেকেই এই দলে যাদের সুমন চেনেন বা চেনেন না। কিন্তু
মাঝে মাঝে স্রষ্টা , সৃষ্টি আর অনুগামীর মধ্যে ফারাক থাকা ভাল। তাতে অচেনার মধ্যে
দিয়ে চেনাকে পাওয়ার আনন্দ রেশ ফেলে যায় – বারবার।
আর সুমন – তিনি অবলিলায়
হিমাংশু দত্তের গান শেষ করে বলে ওঠেন – এই গান আর কেউ তৈরি করতে পারবে না। আর তার
পরেই শুরু করেন – “সন্ধ্যে হল সন্ধ্যে হল...” – আর গান থামিয়ে বলে ওঠেন – “এই
গানটাও আর কেউ বানাতে পারবে না।“
আর আমরা তার শ্রোতারা
একে একে ফিরে আসি যে যার সারিতে, আর স্মৃতির পাতার ভাঁজে ভাঁজে থেকে যায় একটা মঞ্চ
, কিছু কালো মাথা , কিছু গান, কিছু কথা, আর ইতিহাস তৈরির সময়ের কণা ... একক সুমন।
শঙ্খ
৩০.০৪.২০১৭
শঙ্খ
৩০.০৪.২০১৭

Comments
Post a Comment